বাংলাদেশ ০৩:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবের সন্তুষ্টির সন্ধানে: তোষামোদের রঙিন চশমা খুলে ফেলার আহ্বান– এম. আব্দুল্লাহ

বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যান্ত্রিকতার এই যুগে মানুষের মূল্যায়নের মাপকাঠিগুলো যেন বদলে গেছে। আমরা এখন ‘সঠিক’ হওয়ার চেয়ে ‘প্রিয়’ হওয়ার পেছনে বেশি ছুটছি। কর্মক্ষেত্র, পরিবার কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সর্বত্রই যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। এই দৌড়ে টিকে থাকতে হলে অনেকেই আজ তোষামোদের রঙিন চশমা পরতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু এই সাময়িক জনপ্রিয়তা বা সবার কাছে ভালো মানুষ সাজার প্রবণতা আমাদের ব্যক্তি সত্তা ও নৈতিক মেরুদণ্ডকে কতটা ধূলিসাৎ করছে, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? ইসলামের সুমহান শিক্ষা, কুরআনের নির্দেশনা এবং মনীষীদের জীবনদর্শন আমাদের শিখিয়েছে যে, মানুষের সন্তুষ্টির চেয়ে রবের সন্তুষ্টিই জীবনের আসল সফলতা।

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বারবার মুমিনদের সত্যের ওপর অটল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর সাক্ষী হিসেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।” (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)

এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য সত্যকে গোপন করা বা মিথ্যার তোষামোদ করা ইসলামি আদর্শের পরিপন্থী। দুনিয়াবি প্রিয়তা পাওয়ার লোভে যদি আমরা সত্য থেকে বিচ্যুত হই, তবে আমরা পরকালীন চিরস্থায়ী কল্যাণকে বিসর্জন দিচ্ছি।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে আরও সতর্ক করেছেন যে, অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করা সব সময় সত্যের পথ নয়। তিনি বলেন: “আর তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কথা মেনে চলো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে।” (সূরা আল-আনআম: ১১৬)

অর্থাৎ, দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ যদি কোনো ভুল পথকেও জনপ্রিয় করে তোলে তবুও মুমিনের কাজ হলো সত্যের পথে অটল থাকা, তা সে একাকী হলেও।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মানুষের তোষামোদের ঊর্ধ্বে উঠে রবের ভালোবাসা অর্জন করতে হয়। এক হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টির বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, আল্লাহ মানুষের সব বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিনিময়ে মানুষের সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, আল্লাহ তাকে মানুষের কাছেই ছেড়ে দেন।” (সুনানে তিরমিজি)

এই হাদিসটি একটি মূলমন্ত্র আপনি যখন মানুষের প্রিয় হওয়ার জন্য তোষামোদ করেন, তখন আপনি নিজেকে দুর্বল করে ফেলেন। কিন্তু যখন আপনি আল্লাহর প্রিয় হওয়ার জন্য সত্যের পথে অটল থাকেন, তখন আল্লাহ আপনার সম্মান মানুষের অন্তরে গেঁথে দেন। এছাড়া তোষামোদ বা চাটুকারিতা ইসলামে ঘৃণিত কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, “চাটুকারদের মুখে তোমরা মাটি নিক্ষেপ করো।” (সহীহ মুসলিম)

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীরা সব সময় সত্যের পথে অটল থাকাকে জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন: “আমি এমনভাবে কাজ করি যাতে আমার ভাইরা সন্তুষ্ট হয় না, কারণ আমি জানি আমার সব কাজ সবার পছন্দ হবে না। তাই আমি সেই কাজই করি যা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয়।”

হযরত আলী (রা.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি আমাদের আত্মোপলব্ধির জন্য যথেষ্ট: “তুমি যদি সত্যের পথে চলতে গিয়ে একা হয়ে যাও, তবে জেনে রেখো তুমি সঠিক পথেই আছো। কারণ ভিড় তো সবসময় ভুল পথেই বেশি থাকে।”

বিখ্যাত সুফি সাধক হাসান বসরী (রহ.) বলতেন, “যে ব্যক্তি মানুষকে খুশি করতে গিয়ে আল্লাহর নাফরমানি করে আল্লাহ তাকে ওই মানুষের কাছেই লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।” এই উক্তিগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রশংসা বা নিন্দা আমাদের চরিত্রের পরিমাপক হতে পারে না। চরিত্রের পরিমাপক হলো আমাদের ইবাদত ও সততা।

আজকের সমাজব্যবস্থায় আমরা কেন তোষামোদের আশ্রয় নিই? এর প্রধান কারণ হলো নিরাপত্তার অভাব ও খ্যাতির মোহ। আমরা মনে করি, সবাইকে খুশি রাখতে পারলে হয়তো জীবন সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব হলো, সবাইকে খুশি করা অসম্ভব। প্রিয়পাত্র হওয়ার চেষ্টায় আমরা প্রতিনিয়ত নিজের মেরুদণ্ড বাঁকা করছি। আমরা যখন অন্যের মিথ্যা প্রশংসা করি বা অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে নীরব থাকি, তখন আমাদের বিবেক ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে।

এই মরীচিকার পরিণতি বড়ই ভয়াবহ। যখন আমরা নিয়মিত মুখোশ পরে চলি তখন আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের প্রকৃত চেহারাটাই আমরা ভুলে যাই। আমাদের ব্যক্তিত্ব তখন আর আমাদের থাকে না; তা অন্যের ভালো লাগার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এটিই হলো প্রকৃত দাসত্ব। আর ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে কেবল এক আল্লাহর দাসত্ব করতে, মানুষের দাসত্ব করতে নয়।

কীভাবে আমরা সত্যের পথে অটল থাকব-
১. নিয়তের বিশুদ্ধতা (ইখলাস): কোনো কাজ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমি কি এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি, না কি কারো প্রশংসা পাওয়ার জন্য?’ নিয়ত খাঁটি হলে তোষামোদ করার প্রয়োজন পড়বে না।

২. সমালোচনার ভয় ত্যাগ করা: লোকে কী বলবে—এই চিন্তাটিই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। মনীষীরা বলেছেন, ‘লোকে কী বলবে’—এই ভয়ের নামই হচ্ছে ইমানি দুর্বলতা। সত্যের পথে চলার জন্য মানুষকে অপ্রিয় হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে।

৩. জ্ঞানার্জন ও চিন্তার গভীরতা: আপনি যখন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও মনীষীদের জীবনী অধ্যয়ন করবেন, তখন দেখবেন সত্যের পথে অটল থাকার মধ্যে যে শান্তি, তা দুনিয়ার সমস্ত প্রশংসার চেয়ে অনেক বড়।

৪. নিজের ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া: আপনি যদি নিজের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, তবে অন্য কেউ আপনাকে ছোট করার সাহস পাবে না। সততার এক নিজস্ব তেজ আছে, যা তোষামোদের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

দিনশেষে আমরা সবাই একা। কিয়ামতের ময়দানে কোনো পদবি, কোনো জনপ্রিয়তা বা কোনো চাটুকার বন্ধু, নেতা আমাদের পাশে থাকবে না। সেখানে কেবল আমাদের আমল আর রবের প্রতি আমাদের আনুগত্যের হিসাব হবে। মানুষের কাছে প্রিয় হওয়া বা না হওয়া আমাদের জীবনের গন্তব্য নয়। আমাদের জীবনের গন্তব্য হলো আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া।

তাই আসুন, তোষামোদের রঙিন চশমা খুলে ফেলি। সত্যের আলোকে বিশ্বকে দেখি। যদি সত্য কথা বলতে গিয়ে মানুষ আপনাকে এড়িয়ে চলে, তবে ভয় পাবেন না। জেনে রাখবেন আল্লাহ তাদেরই ভালোবাসেন যারা সত্যের পথে অটল থাকে। সাময়িক জনপ্রিয়তার মরীচিকার চেয়ে সত্যের পথে অটল থাকার একাকীত্ব অনেক বেশি তৃপ্তিদায়ক ও সম্মানজনক। কারণ দিনশেষে মানুষ আপনাকে ভুলে যাবে, কিন্তু আপনার রবের সন্তুষ্টিই আপনার চিরস্থায়ী পাথেয় হয়ে থাকবে।

লেখক: সংগঠক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

রবের সন্তুষ্টির সন্ধানে: তোষামোদের রঙিন চশমা খুলে ফেলার আহ্বান– এম. আব্দুল্লাহ

প্রকাশিত: ০৫:১৩:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যান্ত্রিকতার এই যুগে মানুষের মূল্যায়নের মাপকাঠিগুলো যেন বদলে গেছে। আমরা এখন ‘সঠিক’ হওয়ার চেয়ে ‘প্রিয়’ হওয়ার পেছনে বেশি ছুটছি। কর্মক্ষেত্র, পরিবার কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সর্বত্রই যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। এই দৌড়ে টিকে থাকতে হলে অনেকেই আজ তোষামোদের রঙিন চশমা পরতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু এই সাময়িক জনপ্রিয়তা বা সবার কাছে ভালো মানুষ সাজার প্রবণতা আমাদের ব্যক্তি সত্তা ও নৈতিক মেরুদণ্ডকে কতটা ধূলিসাৎ করছে, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? ইসলামের সুমহান শিক্ষা, কুরআনের নির্দেশনা এবং মনীষীদের জীবনদর্শন আমাদের শিখিয়েছে যে, মানুষের সন্তুষ্টির চেয়ে রবের সন্তুষ্টিই জীবনের আসল সফলতা।

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বারবার মুমিনদের সত্যের ওপর অটল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর সাক্ষী হিসেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।” (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)

এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য সত্যকে গোপন করা বা মিথ্যার তোষামোদ করা ইসলামি আদর্শের পরিপন্থী। দুনিয়াবি প্রিয়তা পাওয়ার লোভে যদি আমরা সত্য থেকে বিচ্যুত হই, তবে আমরা পরকালীন চিরস্থায়ী কল্যাণকে বিসর্জন দিচ্ছি।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে আরও সতর্ক করেছেন যে, অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করা সব সময় সত্যের পথ নয়। তিনি বলেন: “আর তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কথা মেনে চলো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে।” (সূরা আল-আনআম: ১১৬)

অর্থাৎ, দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ যদি কোনো ভুল পথকেও জনপ্রিয় করে তোলে তবুও মুমিনের কাজ হলো সত্যের পথে অটল থাকা, তা সে একাকী হলেও।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মানুষের তোষামোদের ঊর্ধ্বে উঠে রবের ভালোবাসা অর্জন করতে হয়। এক হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টির বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, আল্লাহ মানুষের সব বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিনিময়ে মানুষের সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, আল্লাহ তাকে মানুষের কাছেই ছেড়ে দেন।” (সুনানে তিরমিজি)

এই হাদিসটি একটি মূলমন্ত্র আপনি যখন মানুষের প্রিয় হওয়ার জন্য তোষামোদ করেন, তখন আপনি নিজেকে দুর্বল করে ফেলেন। কিন্তু যখন আপনি আল্লাহর প্রিয় হওয়ার জন্য সত্যের পথে অটল থাকেন, তখন আল্লাহ আপনার সম্মান মানুষের অন্তরে গেঁথে দেন। এছাড়া তোষামোদ বা চাটুকারিতা ইসলামে ঘৃণিত কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, “চাটুকারদের মুখে তোমরা মাটি নিক্ষেপ করো।” (সহীহ মুসলিম)

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীরা সব সময় সত্যের পথে অটল থাকাকে জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন: “আমি এমনভাবে কাজ করি যাতে আমার ভাইরা সন্তুষ্ট হয় না, কারণ আমি জানি আমার সব কাজ সবার পছন্দ হবে না। তাই আমি সেই কাজই করি যা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয়।”

হযরত আলী (রা.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি আমাদের আত্মোপলব্ধির জন্য যথেষ্ট: “তুমি যদি সত্যের পথে চলতে গিয়ে একা হয়ে যাও, তবে জেনে রেখো তুমি সঠিক পথেই আছো। কারণ ভিড় তো সবসময় ভুল পথেই বেশি থাকে।”

বিখ্যাত সুফি সাধক হাসান বসরী (রহ.) বলতেন, “যে ব্যক্তি মানুষকে খুশি করতে গিয়ে আল্লাহর নাফরমানি করে আল্লাহ তাকে ওই মানুষের কাছেই লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।” এই উক্তিগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রশংসা বা নিন্দা আমাদের চরিত্রের পরিমাপক হতে পারে না। চরিত্রের পরিমাপক হলো আমাদের ইবাদত ও সততা।

আজকের সমাজব্যবস্থায় আমরা কেন তোষামোদের আশ্রয় নিই? এর প্রধান কারণ হলো নিরাপত্তার অভাব ও খ্যাতির মোহ। আমরা মনে করি, সবাইকে খুশি রাখতে পারলে হয়তো জীবন সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব হলো, সবাইকে খুশি করা অসম্ভব। প্রিয়পাত্র হওয়ার চেষ্টায় আমরা প্রতিনিয়ত নিজের মেরুদণ্ড বাঁকা করছি। আমরা যখন অন্যের মিথ্যা প্রশংসা করি বা অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে নীরব থাকি, তখন আমাদের বিবেক ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে।

এই মরীচিকার পরিণতি বড়ই ভয়াবহ। যখন আমরা নিয়মিত মুখোশ পরে চলি তখন আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের প্রকৃত চেহারাটাই আমরা ভুলে যাই। আমাদের ব্যক্তিত্ব তখন আর আমাদের থাকে না; তা অন্যের ভালো লাগার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এটিই হলো প্রকৃত দাসত্ব। আর ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে কেবল এক আল্লাহর দাসত্ব করতে, মানুষের দাসত্ব করতে নয়।

কীভাবে আমরা সত্যের পথে অটল থাকব-
১. নিয়তের বিশুদ্ধতা (ইখলাস): কোনো কাজ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমি কি এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি, না কি কারো প্রশংসা পাওয়ার জন্য?’ নিয়ত খাঁটি হলে তোষামোদ করার প্রয়োজন পড়বে না।

২. সমালোচনার ভয় ত্যাগ করা: লোকে কী বলবে—এই চিন্তাটিই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। মনীষীরা বলেছেন, ‘লোকে কী বলবে’—এই ভয়ের নামই হচ্ছে ইমানি দুর্বলতা। সত্যের পথে চলার জন্য মানুষকে অপ্রিয় হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে।

৩. জ্ঞানার্জন ও চিন্তার গভীরতা: আপনি যখন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও মনীষীদের জীবনী অধ্যয়ন করবেন, তখন দেখবেন সত্যের পথে অটল থাকার মধ্যে যে শান্তি, তা দুনিয়ার সমস্ত প্রশংসার চেয়ে অনেক বড়।

৪. নিজের ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া: আপনি যদি নিজের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, তবে অন্য কেউ আপনাকে ছোট করার সাহস পাবে না। সততার এক নিজস্ব তেজ আছে, যা তোষামোদের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

দিনশেষে আমরা সবাই একা। কিয়ামতের ময়দানে কোনো পদবি, কোনো জনপ্রিয়তা বা কোনো চাটুকার বন্ধু, নেতা আমাদের পাশে থাকবে না। সেখানে কেবল আমাদের আমল আর রবের প্রতি আমাদের আনুগত্যের হিসাব হবে। মানুষের কাছে প্রিয় হওয়া বা না হওয়া আমাদের জীবনের গন্তব্য নয়। আমাদের জীবনের গন্তব্য হলো আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া।

তাই আসুন, তোষামোদের রঙিন চশমা খুলে ফেলি। সত্যের আলোকে বিশ্বকে দেখি। যদি সত্য কথা বলতে গিয়ে মানুষ আপনাকে এড়িয়ে চলে, তবে ভয় পাবেন না। জেনে রাখবেন আল্লাহ তাদেরই ভালোবাসেন যারা সত্যের পথে অটল থাকে। সাময়িক জনপ্রিয়তার মরীচিকার চেয়ে সত্যের পথে অটল থাকার একাকীত্ব অনেক বেশি তৃপ্তিদায়ক ও সম্মানজনক। কারণ দিনশেষে মানুষ আপনাকে ভুলে যাবে, কিন্তু আপনার রবের সন্তুষ্টিই আপনার চিরস্থায়ী পাথেয় হয়ে থাকবে।

লেখক: সংগঠক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট