বিশ্ব মা দিবস: যে মানুষটাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তাকেই কখনো বলা হয়নি
বিশ্ব মা দিবস: অন্যের গল্প লিখতে লিখতে মায়ের গল্পটাই বলা হয়নি
রকিবুল ইসলাম রকি ::
সংবাদ ও সাংবাদিকতার পেশায় থাকার কারণে প্রতিদিনই আমাকে নানা মানুষের গল্প লিখতে হয়। কারও সংগ্রাম, কারও কান্না, কারও হারিয়ে যাওয়ার বেদনা, কারও জীবনের কঠিন বাস্তবতা,এসব নিয়েই গড়ে ওঠে আমার প্রতিদিনের কাজ। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সমাজের অজানা গল্পগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরাই দায়িত্ব।
কিন্তু এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একটি বিষয় প্রায়ই অদেখা থেকে যায়,নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির গল্প। আজ বিশ্ব মা দিবস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাকে নিয়ে অসংখ্য লেখা, ছবি আর স্মৃতিচারণ চোখে পড়ছে। সেই ভিড়ের মধ্যেই মনে হলো, প্রতিদিন এত মানুষের গল্প লিখি, অথচ নিজের মাকে নিয়ে কখনো দু’কলম লিখা হয়নি।
হয়তো এর কারণ, “মা”কে নিয়ে লিখতে বসলে শব্দগুলো আর যথেষ্ট মনে হয় না। বিশ্ব মা দিবসের ইতিহাস বলছে, মায়ের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে আধুনিকভাবে এই দিবসের সূচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রে।
১৯০৮ সালে আনা জার্ভিস তার মায়ের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রথম উদ্যোগ নেন। পরে ১৯১৪ সালে এটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। এখন বিশ্বের বহু দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস পালিত হয়।
তবে বাস্তবতা হলো, মায়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মা এমন এক সম্পর্ক, যা প্রতিদিনের, প্রতিক্ষণের। আমার ব্যক্তিগত জীবনেও এই সত্য প্রতিদিন নতুনভাবে ধরা দেয়।
গণমাধ্যমে কাজ করার সুবাদে মাঝেমধ্যে বাসায় ফিরতে অনেক সময় গভীর রাত হয়ে যায়। সময়ের কোনো নির্দিষ্টতা নেই। কিন্তু যত রাতই হোক, বাসায় ফিরলে একটা দৃশ্য প্রায়ই একই থাকে,আম্মু অপেক্ষা করছেন। তার প্রথম প্রশ্ন— “খেয়েছিস?”
এই প্রশ্নটি হয়তো সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে যে গভীর মমতা, তা বুঝতে হলে একজন সন্তানের জায়গায় দাঁড়াতে হয়। প্রায়ই আমি নানা অজুহাত দিই। কখনো বলি, এখন খাব না। কখনো বলি, এটা দিয়ে খাব না, ওটা হলে খাব। কখনো বলি, বাইরে খেয়ে এসেছি। কিন্তু মা’রা অজুহাত বোঝেন না, তারা বোঝেন সন্তানের প্রয়োজন।
তাই রাত যতই হোক, ক্লান্তি যতই থাকুক, গরম যতই তীব্র হোক, তিনি আবার রান্নাঘরে যান। কখনো ডিম ভেজে আনেন, কখনো নতুন করে ভাত গরম করেন, কখনো শুধু নিশ্চিত হতে চান,আমি খেয়ে আসছি কিনা।
এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসার প্রকাশ। আমরা অনেক সময় ভাবি, ভালোবাসা মানে বড় বড় শব্দ, বড় আয়োজন, বিশেষ উপলক্ষ। অথচ মায়ের ভালোবাসা প্রকাশ পায় সবচেয়ে সাধারণ আচরণে, অপেক্ষায়, খোঁজ নেওয়ায়, জোর করে খাওয়াতে চাওয়ায়।
সাংবাদিকতা পেশায় থাকার কারণে আমি অসংখ্য মায়ের গল্প দেখেছি। দেখেছি সন্তান হারানো মায়ের কান্না, দেখেছি সন্তানকে মানুষ করতে জীবনভর সংগ্রাম করা মায়ের মুখ। সেই গল্পগুলো লিখেছি, প্রচার করেছি। কিন্তু নিজের মায়ের গল্পটা কখনো লেখা হয়নি। হয়তো কারণ, এই গল্পটা খুব ব্যক্তিগত। খুব গভীর। আর সবচেয়ে সত্য।
আমরা যত বড় হই, যত দায়িত্বশীল হই, যত ব্যস্ত হই, জীবনের একটা জায়গায় এসে বুঝতে পারি, পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা হলো মা। মা থাকলে ঘর শুধু একটি বাড়ি থাকে না, সেটি আশ্রয় হয়ে ওঠে।
মাঝেমধ্যে গভীর রাতে কাজ শেষে বাসায় ফিরে যখন দেখি আম্মু এখনো জেগে আছেন, শুধু আমার জন্য, তখন মনে প্রশ্ন জাগে,এই মানুষটা যদি একদিন না থাকেন, তাহলে এই অপেক্ষার জায়গাটা কে পূরণ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর নেই।
কারণ সত্যি বলতে, মায়ের জায়গা পৃথিবীর কোনো সম্পর্ক দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। বিশ্ব মা দিবসের মূল শিক্ষা হয়তো এখানেই,মা’কে শুধু ভালোবাসার কথা বলার জন্য একটি দিন নয়, বরং তার ত্যাগ ও অবদানের কথা নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ।
আমরা জীবনে অনেককে ধন্যবাদ দিই, অনেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। অথচ যে মানুষটি জন্মের পর থেকে প্রতিটি মুহূর্তে নিঃস্বার্থভাবে পাশে থেকেছেন, তাকে কখনো বলতে পারিনি, বড্ড ভালোবাসি আম্মু তুমায়।
মা দিবসে তাই আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি একটাই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গল্প, সবচেয়ে সত্য গল্প, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ গল্প হলো একজন মায়ের গল্প। আর সেই গল্পের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, মা থাকলে জীবন অনেকটাই সহজ, অনেকটাই নিরাপদ।
তাই মা দিবসে শুধু আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয়, প্রতিজ্ঞা হোক,যতদিন মা আছেন, তার পাশে থাকার, তার খোঁজ নেওয়ার, তার অপেক্ষার মূল্য বোঝার।
কারণ জীবনের অনেক শূন্যতা পূরণ হয়,
কিন্তু মা হারানোর শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না।











