কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এবারের ঈদ যেন আনন্দের নয়, বরং টিকে থাকার আরেকটি কঠিন পরীক্ষা। খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় অধিকাংশ পরিবার এখন দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। ফলে কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, ঈদের দিনে সামান্য মাংস খাওয়াও অনেকের কাছে স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগে মাথাপিছু ১২ ডলার খাদ্য সহায়তা পেলেও বর্তমানে সহায়তা কমে ১০ ডলারে নামায় এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই এবারের ঈদে গরুর মাংসের বদলে একটি ব্রয়লার মুরগিই তাঁদের উৎসবের একমাত্র ভরসা।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) চলতি বছরের এপ্রিল থেকে নতুন সহায়তা কাঠামো চালু করেছে। এখন পরিবারগুলোর ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সহায়তা ভাগ করা হচ্ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার মাথাপিছু ১২ ডলার পেলেও মাঝারি ঝুঁকির পরিবার পাচ্ছে ১০ ডলার এবং অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার পাচ্ছে মাত্র ৭ ডলার।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, ক্যাম্পের প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ আগের তুলনায় কম সহায়তা পাচ্ছে। এর মধ্যে অর্ধেক পরিবার ১০ ডলার এবং ১৭ শতাংশ পরিবার ৭ ডলার সহায়তার আওতায় এসেছে। ফলে বহু পরিবার এখন সীমিত আয়ে জীবনযুদ্ধ চালাতে বাধ্য হচ্ছে।
ক্যাম্পের বাসিন্দা আবেদ উল্লাহ বলেন, তাঁদের পরিবার বর্তমানে মাথাপিছু মাত্র ৭ ডলার পায়। এতে খাবারের চাহিদাই ঠিকমতো পূরণ হয় না। তিনি বলেন, “ঈদ উদযাপন এখন স্বপ্নের মতো। কিছু টাকা জোগাড় করতে পারলে হয়তো সামান্য গরুর মাংস কিনব, কিন্তু কোরবানি দেওয়ার কথা ভাবাও যায় না।”
ক্যাম্প-১৮ এর বাসিন্দা কালাম জানান, যেসব পরিবারের বিদেশে আত্মীয়স্বজন আছেন, তারাই কেবল ভাগে কোরবানিতে অংশ নিতে পারছেন। অনেক সময় প্রায় ১০০ জন মিলে একটি গরু কিনে ভাগাভাগি করেন। তবে অধিকাংশ মানুষের জন্য সেটিও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করা স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক এনজিওর কর্মী নাজমুল হোসেন বলেন, “খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শিশুদের পুষ্টিহীনতা, মানসিক চাপ এবং পরিবারগুলোর হতাশা দিন দিন বাড়ছে। ঈদ সামনে রেখে অনেক মা-বাবা সন্তানদের ছোট ছোট চাওয়াও পূরণ করতে পারছেন না।”
তিনি আরও বলেন, “আগে বিভিন্ন সংস্থা পর্যাপ্ত কোরবানির মাংস বিতরণ করতে পারত। কিন্তু আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়ায় এবার সহায়তার পরিমাণও সীমিত হয়ে গেছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি অন্তত প্রতিটি পরিবার যেন কিছুটা মাংস পায়।”
এদিকে বিভিন্ন এনজিও সংস্থাও আগের তুলনায় কম পরিমাণে কোরবানির পশু ও মাংস বিতরণ করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে আরআরআরসি কার্যালয় বলছে, অন্তত প্রতিটি পরিবার যেন কিছুটা মাংস পায়, সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও অন্তত এক কেজি করে মাংস প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। তাঁর মতে, সন্তানদের মুখে ঈদের দিনে কোরবানির মাংস তুলে দিতে না পারার কষ্ট অনেক বাবা-মাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত আনন্দের ঈদ হবে তখনই, যখন তারা নিরাপদে নিজ ভূমি রাখাইনে ফিরতে পারবে। এজন্য তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন ঈদকে ঘিরে উৎসবের আমেজ, তখন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে ঈদের আনন্দকে ছাপিয়ে গেছে ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘ বাস্তুচ্যুত জীবনের বেদনা।










