রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা কারওয়ান বাজারে প্রভাব বিস্তার ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা মো. আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী বিনাশ দাদা ওরফে দিলীপের নির্দেশে ভাড়াটে শুটার ব্যবহার করে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রকাশ্য ও গোপনভাবে চাঁদা আদায়ের সঙ্গে জড়িত অন্তত আট থেকে নয়টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছিল, যার জের ধরেই মুসাব্বিরকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ডিবি প্রধান জানান, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় দুই শুটার—জিন্নাত ও রহিম। এর মধ্যে জিন্নাতকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং সর্বশেষ শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) নরসিংদীর মাধবদী থানা এলাকা থেকে রহিমকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে, অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটে খুনি হিসেবে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় তারা। গ্রেপ্তারের সময় রহিমের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ১২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় রহিমের বিরুদ্ধে মাধবদী থানায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে—অস্ত্র হাতে নিয়ে জিন্নাত ও রহিম ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ফুটেজসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
ডিবি জানায়, গত ৭ জানুয়ারি রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরী পাড়ার হোটেল সুপার স্টারের গলিতে গুলিবিদ্ধ হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান মুসাব্বির। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় চার থেকে পাঁচজন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এর আগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সর্বশেষ রহিম গ্রেপ্তার হওয়ায় এ মামলায় মোট পাঁচজন আসামি আটক হলো। ইতোমধ্যে শুটার জিন্নাত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বিদেশে বসে ‘দাদার’ নির্দেশ
হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উঠে এসেছে বিনাশ দাদা ওরফে দিলীপের নাম। ডিবি প্রধান জানান, বিনাশ দাদা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তার নির্দেশেই ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রিত হয়। গ্রেপ্তার হওয়া জিন্নাত আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে স্বীকার করেছে, ‘দাদার’ নির্দেশেই এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। অপরাধীদের উৎসাহ দিতে প্রায়ই বলা হতো—‘দাদা আছে, সব সামলে নেবে’। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নেই; চাঁদাবাজির স্বার্থে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে থাকে।
এদিকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাস দমনে ডিবির অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ডিবি ওয়ারী বিভাগের একটি দল শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, সাত রাউন্ড গুলি ও একটি মোটরসাইকেলসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—মো. রানা মোল্লা (২৬) ও নূর মোহাম্মদ (৩২)। ডিবি জানিয়েছে, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।














