মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার শান্ত জনপদ ৬ নম্বর আশীদ্রোণ ইউনিয়নে এখন বইছে অশান্তির কালো ছায়া। নিভৃত এ ইউনিয়নের চারটি গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এক বিএনপি নেতার কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে নানা ধরণের প্রতারণা, মামলা বাণিজ্য, মামলা করে নিরীহ গ্রামবাসীদের হয়রানী, জালিয়াতিসহ নানা অন্যায়-দুর্নীতির অভিযোগ। তার মামলা থেকে রেহাই পায়নি বিএনপির নেতা থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকর্মীও।
প্
আশীদ্রোণ ইউনিয়নের জিলাদপুর গ্রামে নামমাত্র প্রতিষ্ঠিত এবং কোন ধরণের শ্রেণি ও অফিসিয়্যাল কার্যক্রম না থাকা হাজী এছাক মিয়া হাজেরা বেগম মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং ওই ইউনিয়নের তিতপুর গ্রামের মরহুম এছাক মিয়ার ছেলে। ওই নেতা এক সময় আওয়ামী লীগের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চললেও এখন শ্রীমঙ্গল পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহবায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য। ওই নেতার নাম মো. আলতাফুর রহমান নাজমুল হাসান।
অতি সম্প্রতি আলতাফ তার দল তথা বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির আহবায়ক মো. আশরাফুল ইসলাম লিয়াকতসহ ১৬ জনকে আসামি করে মামলা করেছে আদালতে। ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে দৈনিক খোলাকাগজ পত্রিকার মৌলভীবাজার জেলার স্টাফ রিপোর্টার মো. এহসানুল হককেও।
সরজমিনে তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৬ নম্বর আশিদ্রোণ ইউনিয়নের তিতপুর গ্রামের বাসিন্দা আলতাফুর রহমান নাজমুল হাসানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন ইউনিয়নের আশিদ্রোণ, তিতপুর, জিলাদপুর এবং খোশবাস এ চার গ্রামের সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়রা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে জানান, ওই ইউনিয়নের সর্বত্র মামলাবাজ হিসেবে পিরিচিত আলতাফ আওয়ামী আমলে ছিলেন আওয়ামী লীগের লোক। ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন জাতীয় সংসদের চিফ হইপ আব্দুস শহীদের স্বাক্ষর জাল করে কারাবরণও করেন। এমনকি তার নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি তার আপন বড় ভাই ও বড় ভাইয়ের পরিবারের সদস্যরাও।
সরজমিনে অনুসন্ধানকালে জানা গেছে, আশিদ্রোন ইউনিয়নের জিলাদপুর গ্রামে ২০০৩ সালে হাজী এছাক মিয়া হাজেরা বেগম মডেল স্কুল নামে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।
এক সময় রাজমিস্ত্রীর যুগালী আলতাফ নিজেই হন ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক। এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর কিছুদন পাঠদান চালু থাকলেও শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক সংকটে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নেই। প্রতিষ্ঠান না থাকলেও তিনি প্রধান শিক্ষক। কিন্তু প্রতি বছরই প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি শ্রেণিতে শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ং থেকে সরকারি বই গ্রহণ করছেন।
আলতাফ প্রতি বছর সরকারি বই বিক্রি করে এবং স্কুলের নামে নানাভাবে বরাদ্দ ও প্রকল্প এনে আত্মসাৎ করছেন। আইডিয়া নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) থেকে গভীর নলকূপ এনে তার স্থাপন করে তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। বিভিন্ন এলাকার শতাধিক মানুষকে প্রায় ২০টির অধিক মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।
বক্সপপ- কয়েকজন ভুক্তভোগী।
ভুক্তভোগীরা জানান, ‘আলতাফুর রহমান অনেক বাটপারী, অনেক চিটারি করছে আমাদের সাথে। আলতাফ যে স্কুল করেছে সে স্কুলে কোন ছাত্র নাই, কোন মাস্টার নাই।’ স্কুলের কার্যক্রম না থাকলেও একটি টিনের ঘর বানাইয়া সরকারি বই আনে এবং বেচে দেয়। সরকারি একটি টিউবওয়েল আনলেও তা কোন কাজে লাগতেছে না। এলাকার মানুষও ওই টিউবওয়েল থেকে পানি নিতে পারে না। তার অনিয়মের কথা বললেই সে একের পর এক হয়রানী মামলা করে চলেছে। ‘আলতাফ আগে আছিল সে আওয়ামী লীগ, এখন অইছে বিএনপি। বিএনপিতে আওয়ার পরে মানুষরে জ্বালাই লাইতাছে।’ বিদেশ যাইতো কইরা আইডি কার্ড সংশোধনের দরকার আছিল। আলতাফ সংশোধন করাইয়া দিব কইয়া আমার কাছ থাকি ধাপে ধাপে ২০ হাজার টাকা নিচে।
বক্সপপ- অভিযুক্ত মো. আলতাফুর রহমান নাজমুল হাসান।
নানা অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা মো. আলতাফুর রহমান নাজমুল হাসানের বক্তব্য নিতে গেলে তিনি স্কুল সম্পর্কে কোন কথা বলতে অনিহা প্রকাশ করেন। আমি এলাকাবাসীকে কোন মামলা করিনি।
বক্সপপ- শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির আহবায়ক নুরুল আলম সিদ্দিকী।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির আহবায়ক নুরুল আলম সিদ্দিকী বলেন, আমি যতটুকু জানি আলতাফুর রহমান আওয়ামী লীগেরও লোক ছিল। কিন্তু আমাদের দল ইদানিং ক্ষমতায় আসার পরে বিভিন্ন জায়গায় সে দল ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন অফিসে সে বিভিন্ন কায়দা-কানুন করতে চাইতেছে।
সট- উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পেরেছি বা শুনেছি এখানে তার স্কুলটার অবস্থা ভগ্নদশা, এখানে পাঠদান হয় না। সরকারি বই বিক্রির অভিযোগটি প্রমাণিত হলে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সিংক- শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসলাম উদ্দিন।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘আলতাফের নানা অভিযোগ নিয়ে সর্বত্র কথাবার্তা হচ্ছে সেগুলো আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেনেছি। সার্বিক বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান উল্লেখ করে মতামতসহ প্রতিবেদন দেওয়া জন্য ইতোপূর্বে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে বলেছিলাম।













