বাংলাদেশ ০৩:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাইরাল পোস্টে জেলা হাসপাতালে ওষুধ কেলেঙ্কারির অভিযোগ

১৯ ফেব্রুয়ারী— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ফেসবুক পোস্টে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর জেলায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

পোস্টে দাবি করা হয়, হাসপাতালের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন—এক হাজার বক্স মন্টিলুকাস্ট-১০ (Montelukast 10 mg) ট্যাবলেটও একদিনে শেষ হয়ে যেতে পারে। এত বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ কীভাবে দ্রুত শেষ হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, নকল স্লিপ ও প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ওষুধ সরিয়ে নিচ্ছে। একেকটি স্লিপে ২০ থেকে ৩০টি করে বিভিন্ন ওষুধ লেখা থাকে। নিয়মিতভাবে যে ওষুধগুলোর নাম উল্লেখ থাকে, তার মধ্যে রয়েছে Montelukast 10 mg, Fexofenadine 120 mg, Esomeprazole 20 mg, Paracetamol 500 mg, বিভিন্ন ভিটামিন ট্যাবলেট ও সিরাপ, Calcium Tablet ও Histacin Tablet।

পোস্টে আরও দাবি করা হয়, কিছু অসাধু কর্মচারী ও মৌলভীবাজার মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে (MATS) সাবেক ও বর্তমান শিক্ষানবিশরা নকল স্লিপের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ওষুধ বাইরে পাচার করছেন। এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাসায় সরকারি ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে । ওষুধ বিতরণ বিভাগের কিছু সদস্য এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।

এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ সদস্য এবং কিছু সাংবাদিকও নকল স্লিপের মাধ্যমে ওষুধ নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে পোস্টে উল্লেখ করা হয়। মৌলভীবাজার-৩ আসনে নির্বাচন করা এক ব্যক্তির নামও তালিকায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

পোস্টে আরও বলা হয়, কেউ চাইলে ১৫ দিনের মধ্যে ২ থেকে ৪ বস্তা পর্যন্ত ওষুধ সংগ্রহ করতে পারেন। ইতোমধ্যে বহু স্লিপ ও প্রেসক্রিপশন জব্দ হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মাত্র ১০ দিন পরিচয় গোপন রেখে ওষুধ বিতরণ বিভাগের সামনে পর্যবেক্ষণ করলেই জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব।

তবে তিনি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ড্রেনে ফেলা হয়—এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সেগুলো অপসারণ করা হয়। যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার করলে তা গুজবে পরিণত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (উপ-পরিচালক) ডা. প্রণয় কান্তি দাশ বলেন, বিষয়টি তিনি অনলাইনে দেখেছেন। শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তিন সদস্যের এ কমিটিতে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার থাকবেন। অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে বলে তিনি জানান।

পাপিয়া সুলতানা নামে এক রোগী বলেন, হাসপাতালে অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শুধু ওষুধ বিতরণ বিভাগ নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি রয়েছে। অল্পদিনে অনেক কর্মচারী বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

শেজুল আহমদ নামে আরেকজন বলেন, হাসপাতালের ভেতরে বাণিজ্য চলছে। প্রতি বছর অডিট হলেও আপত্তিগুলো পরে আর সামনে আসে না। অতীতে ওষুধ সরবরাহ ও আউটসোর্সিং ঠিকাদারীও সরকারী কর্মচারীরা চালিয়ে যাচ্ছেন। আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগেও বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তোলেন তিনি।
একই কথা বলেন, জাহান নামের একজন বলেন, আগে আওয়ামীলীগের লোকেরা নিয়ন্ত্রন করতো, নেতাদের ভাগ নেতারা পেতেন। আর এখন বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে পাতিনেতারা ভাগ নিচ্ছেন। মূলত তারা বিএনপির কোন পদপদবিতে নেই। বা কোন কমিটিতেও নেই। কিন্তু তারা প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী অভিযোগ করেন, খাবারের মান নিম্নমানের হলেও কেউ কথা বলতে পারেন না। ব্যবস্থাপনায় থাকা ব্যক্তিরাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেন তিনি।

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় চেম্বারে চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকেন এবং মৌলভীবাজার মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (MATS) শিক্ষানবিশরা রোগী দেখেন। চিকিৎসক ও নার্সদের অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগও তোলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনা চলছে।”

ভাইরাল পোস্টের পর জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ওষুধ ব্যবস্থাপনায় আদৌ কতটা জবাবদিহিতা রয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।

ভাইরাল পোস্টে জেলা হাসপাতালে ওষুধ কেলেঙ্কারির অভিযোগ

প্রকাশিত: ১১:১৮:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

১৯ ফেব্রুয়ারী— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ফেসবুক পোস্টে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর জেলায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

পোস্টে দাবি করা হয়, হাসপাতালের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন—এক হাজার বক্স মন্টিলুকাস্ট-১০ (Montelukast 10 mg) ট্যাবলেটও একদিনে শেষ হয়ে যেতে পারে। এত বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ কীভাবে দ্রুত শেষ হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, নকল স্লিপ ও প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ওষুধ সরিয়ে নিচ্ছে। একেকটি স্লিপে ২০ থেকে ৩০টি করে বিভিন্ন ওষুধ লেখা থাকে। নিয়মিতভাবে যে ওষুধগুলোর নাম উল্লেখ থাকে, তার মধ্যে রয়েছে Montelukast 10 mg, Fexofenadine 120 mg, Esomeprazole 20 mg, Paracetamol 500 mg, বিভিন্ন ভিটামিন ট্যাবলেট ও সিরাপ, Calcium Tablet ও Histacin Tablet।

পোস্টে আরও দাবি করা হয়, কিছু অসাধু কর্মচারী ও মৌলভীবাজার মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে (MATS) সাবেক ও বর্তমান শিক্ষানবিশরা নকল স্লিপের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ওষুধ বাইরে পাচার করছেন। এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাসায় সরকারি ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে । ওষুধ বিতরণ বিভাগের কিছু সদস্য এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।

এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ সদস্য এবং কিছু সাংবাদিকও নকল স্লিপের মাধ্যমে ওষুধ নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে পোস্টে উল্লেখ করা হয়। মৌলভীবাজার-৩ আসনে নির্বাচন করা এক ব্যক্তির নামও তালিকায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

পোস্টে আরও বলা হয়, কেউ চাইলে ১৫ দিনের মধ্যে ২ থেকে ৪ বস্তা পর্যন্ত ওষুধ সংগ্রহ করতে পারেন। ইতোমধ্যে বহু স্লিপ ও প্রেসক্রিপশন জব্দ হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মাত্র ১০ দিন পরিচয় গোপন রেখে ওষুধ বিতরণ বিভাগের সামনে পর্যবেক্ষণ করলেই জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব।

তবে তিনি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ড্রেনে ফেলা হয়—এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সেগুলো অপসারণ করা হয়। যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার করলে তা গুজবে পরিণত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (উপ-পরিচালক) ডা. প্রণয় কান্তি দাশ বলেন, বিষয়টি তিনি অনলাইনে দেখেছেন। শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তিন সদস্যের এ কমিটিতে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার থাকবেন। অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে বলে তিনি জানান।

পাপিয়া সুলতানা নামে এক রোগী বলেন, হাসপাতালে অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শুধু ওষুধ বিতরণ বিভাগ নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি রয়েছে। অল্পদিনে অনেক কর্মচারী বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

শেজুল আহমদ নামে আরেকজন বলেন, হাসপাতালের ভেতরে বাণিজ্য চলছে। প্রতি বছর অডিট হলেও আপত্তিগুলো পরে আর সামনে আসে না। অতীতে ওষুধ সরবরাহ ও আউটসোর্সিং ঠিকাদারীও সরকারী কর্মচারীরা চালিয়ে যাচ্ছেন। আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগেও বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তোলেন তিনি।
একই কথা বলেন, জাহান নামের একজন বলেন, আগে আওয়ামীলীগের লোকেরা নিয়ন্ত্রন করতো, নেতাদের ভাগ নেতারা পেতেন। আর এখন বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে পাতিনেতারা ভাগ নিচ্ছেন। মূলত তারা বিএনপির কোন পদপদবিতে নেই। বা কোন কমিটিতেও নেই। কিন্তু তারা প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী অভিযোগ করেন, খাবারের মান নিম্নমানের হলেও কেউ কথা বলতে পারেন না। ব্যবস্থাপনায় থাকা ব্যক্তিরাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেন তিনি।

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় চেম্বারে চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকেন এবং মৌলভীবাজার মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (MATS) শিক্ষানবিশরা রোগী দেখেন। চিকিৎসক ও নার্সদের অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগও তোলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনা চলছে।”

ভাইরাল পোস্টের পর জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ওষুধ ব্যবস্থাপনায় আদৌ কতটা জবাবদিহিতা রয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।