বাংলাদেশ ০৭:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্ধেক-বিপ্লব: চূড়ান্ত নির্মূল এর ম্যান্ডেট উপেক্ষার ফল- এম. আব্দুল্লাহ

বিপ্লবের পর একটি দীর্ঘ ও কঠিন সময় ধরে শত্রু ও প্রতিবিপ্লবীদের চূড়ান্তভাবে নির্মূল করা আবশ্যক। এই দমনের কাজে শুধুমাত্র সময় নয়; প্রয়োজন হয় অফুরন্ত রক্তক্ষরণ ও ইস্পাত কঠিন সংকল্পের। একমাত্র এর পরেই নতুন ব্যবস্থার পায়ের তলার মাটি মজবুত হয়, ভিত্তিপ্রস্তর সুদৃঢ় হয়। ইতিহাসের চাকা যখন ঘুরেছিল, ‘জুলাইয়ের অভ্যুত্থান’ ছিল আমাদের হাতে আসা এক পবিত্র ম্যান্ডেট। পুরাতনকে ভেঙে নতুন এক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সেই সুযোগ। কিন্তু যারা মঞ্চে এসেছিল তারা ভুলে গেল এক মৌলিক সত্য: বিপ্লব হলো এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি, এখানে আপোস বা অর্ধেক কাজ বলে কিছু থাকতে পারে না।

কিন্তু জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর সেই অনিবার্য দমনের প্রাথমিক উদ্যোগটিই নেওয়া হলো না। অথচ বিপ্লবের সমস্ত অর্জনকে ধূলিস্যাৎ হওয়া থেকে রক্ষার জন্য যা ছিল প্রাথমিক ও প্রধান ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট, তা-ই উপেক্ষিত হলো। আর এইখানেই নিহিত ছিল সেই তথাকথিত বিপ্লবীদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

ভ্লাদিমির লেনিন বা চে গুয়েভারার মতো ব্যক্তিত্বরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, বিপ্লবোত্তর দমন হলো নতুন ব্যবস্থার আশ্চর্য প্রসব বেদনা (miraculous birth pangs)। এই বেদনা সহ্য করার ইস্পাত কঠিন সংকল্পের অভাবই ‘জুলাইয়ের’ তথাকথিত বিপ্লবীদের প্রধান ব্যর্থতা। লেনিনের ‘লাল সন্ত্রাস’ (Red Terror) ঘোষণার পেছনের দর্শন এটাই ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, শ্রেণি-শত্রুরা কখনো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেয় না; তাদের অস্তিত্বই নতুন রাষ্ট্রের জন্য চিরস্থায়ী হুমকি।

লেনিনের উত্তরসূরি চে গুয়েভারা এই কঠোরতার প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। তাঁর কাছে বিপ্লব ছিল কঠিনতম অর্জন। আপেল গাছের ফল নয় যে পাকবে আর পড়বে। আর্নেস্তো চে গুয়েভারার উক্তি: “নিষ্ঠুর নেতাদের পতন এবং প্রতিস্থাপন চাইলে নতুন নেতৃত্বকেই নিষ্ঠুর হতে হবে।” চে গুয়েভারার এই শিক্ষা ছিল জুলাইয়ের নেতাদের জন্য এক জ্বলন্ত আয়না। এই তথাকথিত নেতারা ক্ষমতা ভাগাভাগি ও সাময়িক আসনে বসার সংকীর্ণ লোভে নিজেদেরকে সমর্পিত করলো।

জুলাইয়ের তথাকথিত বিপ্লবীরা নিজেদের অভ্যুত্থানকে পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবে পরিণত করার পবিত্র দায়িত্ব উপেক্ষা করে, ক্ষমতা ভাগাভাগি ও সাময়িক আসনে বসার সংকীর্ণ লোভে নিজেদেরকে সমর্পিত করলো। কয়েকদিনের কৌশলগত ভ্রান্তি একটি জাতির ভবিষ্যৎকে দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিল।

‘জুলাইয়ের’ তথাকথিত নেতারা বিপ্লবকে একটি রাজনৈতিক খেলা হিসেবে দেখেছিল। যেখানে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে সাময়িক আসন গ্রহণই ছিল তাদের সংকীর্ণ লক্ষ্য। তারা ভুলে গেল যে, জনতার যে পবিত্র ম্যান্ডেট নিয়ে তারা মঞ্চে এসেছিল তার প্রথম ও প্রধান ঐতিহাসিক দাবি ছিল ‘পুরাতনকে চূড়ান্তভাবে নির্মূল’ করা। এই নেতারা দমন ও নির্মূলের কঠোর কাজটি এড়িয়ে গিয়ে আপোস, সমঝোতা এবং মধ্যপন্থার পথ বেছে নিয়ে বিপ্লবের সমস্ত অর্জনকে এক দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

একই সাথে ক্ষমতার স্বাদ উপভোগ এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাই এই তথাকথিত বিপ্লবীদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তারা বিপ্লবকে চূড়ান্ত পরিণতি দিতে পারেনি, বরং একে পরিণত করেছে এক অর্ধেক-বিপ্লবে। যা ধ্বংসের বীজ বপন করে, কিন্তু নতুন সমাজ নির্মাণে ব্যর্থ হয়।

মুক্তির একমাত্র পথ হলো এই অর্ধেক-বিপ্লবের বিষফলকে অস্বীকার করা এবং প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য ইস্পাত-কঠিন সংকল্পের নেতৃত্বকে সমর্থন করা। ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ এখনও আছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে আপোসবিহীন এক নতুন প্রতিজ্ঞা।

এখনও সময় আছে ঐতিহাসিক ব্যর্থতা স্বীকার করার, ভুল শোধরানোর ও সঠিক কাজটি করার।

লেখক: সংগঠক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট।

অর্ধেক-বিপ্লব: চূড়ান্ত নির্মূল এর ম্যান্ডেট উপেক্ষার ফল- এম. আব্দুল্লাহ

প্রকাশিত: ১২:০৫:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫

বিপ্লবের পর একটি দীর্ঘ ও কঠিন সময় ধরে শত্রু ও প্রতিবিপ্লবীদের চূড়ান্তভাবে নির্মূল করা আবশ্যক। এই দমনের কাজে শুধুমাত্র সময় নয়; প্রয়োজন হয় অফুরন্ত রক্তক্ষরণ ও ইস্পাত কঠিন সংকল্পের। একমাত্র এর পরেই নতুন ব্যবস্থার পায়ের তলার মাটি মজবুত হয়, ভিত্তিপ্রস্তর সুদৃঢ় হয়। ইতিহাসের চাকা যখন ঘুরেছিল, ‘জুলাইয়ের অভ্যুত্থান’ ছিল আমাদের হাতে আসা এক পবিত্র ম্যান্ডেট। পুরাতনকে ভেঙে নতুন এক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সেই সুযোগ। কিন্তু যারা মঞ্চে এসেছিল তারা ভুলে গেল এক মৌলিক সত্য: বিপ্লব হলো এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি, এখানে আপোস বা অর্ধেক কাজ বলে কিছু থাকতে পারে না।

কিন্তু জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর সেই অনিবার্য দমনের প্রাথমিক উদ্যোগটিই নেওয়া হলো না। অথচ বিপ্লবের সমস্ত অর্জনকে ধূলিস্যাৎ হওয়া থেকে রক্ষার জন্য যা ছিল প্রাথমিক ও প্রধান ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট, তা-ই উপেক্ষিত হলো। আর এইখানেই নিহিত ছিল সেই তথাকথিত বিপ্লবীদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

ভ্লাদিমির লেনিন বা চে গুয়েভারার মতো ব্যক্তিত্বরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, বিপ্লবোত্তর দমন হলো নতুন ব্যবস্থার আশ্চর্য প্রসব বেদনা (miraculous birth pangs)। এই বেদনা সহ্য করার ইস্পাত কঠিন সংকল্পের অভাবই ‘জুলাইয়ের’ তথাকথিত বিপ্লবীদের প্রধান ব্যর্থতা। লেনিনের ‘লাল সন্ত্রাস’ (Red Terror) ঘোষণার পেছনের দর্শন এটাই ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, শ্রেণি-শত্রুরা কখনো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেয় না; তাদের অস্তিত্বই নতুন রাষ্ট্রের জন্য চিরস্থায়ী হুমকি।

লেনিনের উত্তরসূরি চে গুয়েভারা এই কঠোরতার প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। তাঁর কাছে বিপ্লব ছিল কঠিনতম অর্জন। আপেল গাছের ফল নয় যে পাকবে আর পড়বে। আর্নেস্তো চে গুয়েভারার উক্তি: “নিষ্ঠুর নেতাদের পতন এবং প্রতিস্থাপন চাইলে নতুন নেতৃত্বকেই নিষ্ঠুর হতে হবে।” চে গুয়েভারার এই শিক্ষা ছিল জুলাইয়ের নেতাদের জন্য এক জ্বলন্ত আয়না। এই তথাকথিত নেতারা ক্ষমতা ভাগাভাগি ও সাময়িক আসনে বসার সংকীর্ণ লোভে নিজেদেরকে সমর্পিত করলো।

জুলাইয়ের তথাকথিত বিপ্লবীরা নিজেদের অভ্যুত্থানকে পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবে পরিণত করার পবিত্র দায়িত্ব উপেক্ষা করে, ক্ষমতা ভাগাভাগি ও সাময়িক আসনে বসার সংকীর্ণ লোভে নিজেদেরকে সমর্পিত করলো। কয়েকদিনের কৌশলগত ভ্রান্তি একটি জাতির ভবিষ্যৎকে দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিল।

‘জুলাইয়ের’ তথাকথিত নেতারা বিপ্লবকে একটি রাজনৈতিক খেলা হিসেবে দেখেছিল। যেখানে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে সাময়িক আসন গ্রহণই ছিল তাদের সংকীর্ণ লক্ষ্য। তারা ভুলে গেল যে, জনতার যে পবিত্র ম্যান্ডেট নিয়ে তারা মঞ্চে এসেছিল তার প্রথম ও প্রধান ঐতিহাসিক দাবি ছিল ‘পুরাতনকে চূড়ান্তভাবে নির্মূল’ করা। এই নেতারা দমন ও নির্মূলের কঠোর কাজটি এড়িয়ে গিয়ে আপোস, সমঝোতা এবং মধ্যপন্থার পথ বেছে নিয়ে বিপ্লবের সমস্ত অর্জনকে এক দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

একই সাথে ক্ষমতার স্বাদ উপভোগ এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাই এই তথাকথিত বিপ্লবীদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তারা বিপ্লবকে চূড়ান্ত পরিণতি দিতে পারেনি, বরং একে পরিণত করেছে এক অর্ধেক-বিপ্লবে। যা ধ্বংসের বীজ বপন করে, কিন্তু নতুন সমাজ নির্মাণে ব্যর্থ হয়।

মুক্তির একমাত্র পথ হলো এই অর্ধেক-বিপ্লবের বিষফলকে অস্বীকার করা এবং প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য ইস্পাত-কঠিন সংকল্পের নেতৃত্বকে সমর্থন করা। ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ এখনও আছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে আপোসবিহীন এক নতুন প্রতিজ্ঞা।

এখনও সময় আছে ঐতিহাসিক ব্যর্থতা স্বীকার করার, ভুল শোধরানোর ও সঠিক কাজটি করার।

লেখক: সংগঠক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট।