আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি ইতোমধ্যে ৩০০ আসনেই তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দলটি নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, যার অংশ হিসেবে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসার এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এবার জামায়াতের মনোনীত প্রার্থীদের তালিকায় ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের সাবেক শিবির নেতারাও এবার মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। দলের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্রমতে, প্রায় ৫০ জন তরুণ মুখকে প্রার্থী হিসেবে কাজ করার জন্য সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। এই তরুণ প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় শিক্ষা, সমাজসেবা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বেশ পরিচিত। তারা ইতোমধ্যে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হয়েছেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তরুণদের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। তারা একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছেন, যা অতীতের বিতর্ক থেকে মুক্ত।
তবে প্রবীণদের বদলে তরুণদের এই আকস্মিক প্রাধান্য দলের ভেতরে সবাই সমানভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। অনেক অভিজ্ঞ নেতা দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরে দাঁড়ালেও, কিছু ক্ষেত্রে অসন্তোষ রয়ে গেছে। ৩০০ আসনের মধ্যে প্রায় সবখানেই মতপার্থক্য মিটিয়ে ফেলা সম্ভব হলেও ব্যতিক্রম ঘটেছে ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে।
এই আসনে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন করে আসা জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিনকে এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এতে তিনি দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেন এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়, যা জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।
দলের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “আমরা দুটি জরিপের ওপর ভিত্তি করে প্রার্থী চূড়ান্ত করি। প্রথমটি হলো তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, এবং দ্বিতীয়টি হলো সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কে জনপ্রিয়। এই দুই জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ময়মনসিংহ-৬ আসনের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।”
তরুণ প্রার্থীদের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা আমাদের তরুণ প্রার্থীসহ সকল মনোনীত প্রার্থীর বিজয় নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। সাধারণ ভোটারদের মাঝেও তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে ইতিবাচক সাড়া দেখতে পাচ্ছি, যা আমাদের উৎসাহিত করেছে।”
এদিকে, ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে মনোনীত তরুণ প্রার্থী ও জেলা নায়েবে আমির কামরুল হাসান মিলন বলেন, “দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। এটি সংগঠনের সিদ্ধান্ত এবং আমি কেবল সেই দায়িত্ব পালন করছি। তবে আমি আগে থেকেই আমার এলাকায় সমাজসেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। এলাকাবাসীও চাইছিলেন আমি প্রার্থী হই, এবং আমি মনে করি দল সেই বিষয়টিকে মূল্যায়ন করেছে।”
সাবেক জেলা আমিরের মনোনয়ন না পাওয়া এবং তার সমর্থকদের বিক্ষোভ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটি একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। কিছু জায়গায় জসিম উদ্দিনের সমর্থকরা বিক্ষোভ করেছেন বলে শুনেছি, কিন্তু সেখানে আমাদের সংগঠনের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন না। মূলত বাইরের কিছু লোক এবং তার স্থানীয় আত্মীয়-স্বজনরাই এর সাথে জড়িত।”
কামরুল হাসান মিলন জয়ের ব্যাপারে তার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “গত ২০ বছরে ফুলবাড়িয়া ও ময়মনসিংহ শহরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়নে আমি যে ভূমিকা রেখেছি, সাধারণ মানুষ তার মূল্যায়ন করবে এবং বিপুল ভোটে আমাকে নির্বাচিত করবে বলে আমার বিশ্বাস। বিগত বছরগুলোর রাজনীতি দেখে মানুষ জামায়াতের রাজনীতির পার্থক্য বুঝতে পারছে। সাধারণ ভোটার, এমনকি সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও এবার পরিবর্তন চায় এবং তাদের সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে ব্যালট বাক্সে।”












